বৃদ্ধাশ্রম

‘ডাক্তার আসলে ডায়বেটিস, ব্লাড প্রেসারটা মেপে লিখে রাখবেন। আমি রাতে ফোন দিব। ঔষুধগুলো দেখে খাইয়ে দিবেন। ফ্রিজে রাখা কোন খাবার-ই আর খেতে দিবেন না। আর আজ নদীর ছোট মাছগুলো রান্না করে দিবেন। স্টেশনে এসে গেছি। এখন আমি রাখছি, মাসি। ভালো থাকবেন, মাকে একটু দেখে রাখবেন,প্লিজ।’

বলেই লাইনটা কেটে দিয়েই মোবাইল ফোন থেকেই সময় দেখে নিল শুভ্র। সকাল ৮ টা ১৫ বাজে। ট্রেণ থেকে নেমেই হাটার বেগ বাড়িয়ে দিল। কনকনে শীত গা-হাত-পা সব হিম ধরে আসে। দ্রুত হাটার কারণ দুইটি। প্রথম কারণ প্রচন্ড শীত, দ্বিতীয় কারণ সকাল ৮ টা ৩০ এর মধ্যে কাংখিত বাসায় পৌছাতে হবে।
চারিদিকে তুষারের স্তুপ। শুধু পিচঢালা রাস্তাটুকু কালো, বাকি সব কিছু সাদা। পাতাশুণ্য গাছগুলো ও সাদা; দাঁড়িয়ে আছে তুষারের চাদর পরে। চারিদিকে নিস্তব্ধ। কেবল নিজের হাটার প্রতিধ্বনি নিজের কানে আসে এমন। দ্রুতবেগে হাটা আর সেই সাথে রাস্তায় ফেলানো অতিরীক্ত সুরকির শব্দে ছন্দের তালে তালে গন্তব্যে চলে আসলো শুভ্র।

ওল্ড হাউজ বিল্ডিং এ ঢুকে ২য় তলায় গিয়ে ডান দিকে তাকাতেই দেখতে পেল দরজাটা খোলা। আগেরদিনগুলোর মত আজকেও দরজাটা খুলে অপেক্ষা করছে।
বাহির থেকে জুতা খোলার শব্দ শুনেই বাসার ভেতরের দরজার ওপাশ থেকে ভারী কন্ঠে বলে উঠলো,
– god morgon
– god morgon,
– Hur mår du?
– jag mår bra och du?
– jag också,
– frukost snälla, ,
– okej , tack

এরপর ব্রেকফাস্ট শুরু করলো । ৮৫ বছরের বৃদ্ধা। স্বামী পরিত্যাক্তা। ছেলে-মেয়েরা যার যার মত নিজেস্ব ফ্লাটে থাকে। ক্রিস্টমাস ডে তে দেখতে আসে। একসাথে ডিনার করে। শরীর কেমন আছে খোঁজ খবর নেয়। ডিনার শেষে অতিথিদের মত আবার চলে যায়। বৃদ্ধার দেখা-শোনা ও ভরণ-পোষণের সম্পূর্ণ ভার সরকারের।

এই যে শুভ্র এসেছে, গল্প করছে। ব্রেকফাস্ট করছে । এরপর বৃদ্ধার কাপড়-চোপড় লন্ড্রি করে দিবে, বাজার করে আনবে। বাজারগুলো ফ্রিজে গুছিয়ে দিবে। রান্নাঘর, বাসা পরিস্কার করবে। এগুলোই শুভ্র’র জব। যতঘন্টা এখানে থাকবে, সেই ঘন্টা মাফিক তার বেতন।

শুভ্র একেক দিন একেক বৃদ্ধাশ্রমের একেক জনের বাসায় যায়। কবে কোন বৃদ্ধাশ্রমের কোন বাসায় যাবে এটা তার কোম্পানির বস তাকে জানিয়ে দেয়।
বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিটি বাসা-ই প্রকান্ড বড়। জিনিস পত্রের কোন কিছুরই অভাব নেই। টিভি, ফ্রিজ, হিটার, খাবার, মিউজিক ইনস্ট্রুমেন্ট ইত্যাদি রয়েছে। তবে যা কিছুর অভাব আছে সেটা হল কথা বলবার মত একজন মানুষ।

শুভ্র সেবা-শুশ্রুষা বিক্রি করে। কখনো কোন বৃদ্ধের জন্য, কখনো কোন বৃদ্ধার জন্য। এই বৃদ্ধ বা বৃদ্ধারা শুভ্র’র কাছ থেকে যতটুকু সেবা ক্রয় করে তার থেকেও বেশি ক্রয় করে কথা বলবার সময়। পেমেন্ট অবশ্য সরকার-ই প্রদান করে। তবুও সময় টা তো শুভ্রকেই দিতে হয়।

সাধারণত সুইডিশরা খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে। এবং খুব সকালেই তারা তাদের ব্রেকফাস্ট করে নেয়। কিন্ত যেদিন শুভ্রর যার বাসায় যাবার কথা থাকে, সেদিন সেই বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা সকালে ব্রেকফাস্ট করে না। বরং শুভ্র’র জন্য অপেক্ষা করে। কখনো কখনো তাদের প্রতীক্ষার তাড়না এতই তীব্র থাকে যে, তারা শুভ্র’র আসার সময় হবার অনেক আগের থেকেই বাসার দরজা খুলে অপেক্ষা করতে থাকে।

তাদের অপেক্ষা যে এক সাথে ব্রেকফাস্ট করার জন্য এমন নয়। বরং ব্রেকফাস্টের সময়ে সে কথা বলবে আর শুভ্র শুনবে এই জন্যে। কথা বলার মধ্যে যে কত সুখ, সেটা শুভ্র ওদের কথা বলার আকাংখা দেখেই উপলব্ধি করে।

যাইহোক, শুভ্র সেবা-শুশ্রুষা ও তার সময় বিক্রি করে। আর এই উপার্জিত টাকার কিছু অংশ দেশে পাঠায় তার বৃদ্ধা মা’য়ের জন্য।

শুভ্র’র মা এক নিভৃত পল্লীতে একাকী বসবাস করে। শুভ্র’র বাবা বছর দশেক আগে মারা গেছে। আর স্ত্রী-পুত্র নিয়ে শুভ্র সুইডেনে স্থায়ী নাগরিক। শুভ্র’র মা যে বাসায় থাকে সেই বাসাটাও প্রকান্ড বড়। এ বাসাতেও জিনিস পত্রের কোনই অভাব নেই। টিভি-ফ্রিজ, খাবার ও অন্যান্য আসবাবপত্রে ভরপুর। কিন্ত এ বাসাতেও যা কিছুর অভাব আছে তা হল পাশে বসে একটু কথা শুনা বা কথা্র প্রসঙে কথা বলবার মত একজন মানুষ। শুভ্র বছরে দূর্গাপূজার মধ্যে একবার গিয়ে মাকে দেখে খোঁজ-খবর নিয়ে আসে। আর বাকি দিনগুলোর কিছু সময় ভিডিও কলিং এ কথা বলে।

শুভ্র’র মাকেও দেখাশুনা করার জন্য একজন লোক রাখা হয়েছে। তার নাম গোপী মাসি। উনি প্রতিদিন এসে শুভ্র’র মায়ের সাথে একসাথে খাবার খায়, গল্প করে, কাপড়-চোপড় পরিস্কার করে, বাজার করে, রান্না করে ও ঔষুধ খাইয়ে দিয়ে নিজ বাসায় চলে যায় ।
শুভ্র’র মাও গোপী মাসির সঙ্গে এক সাথে খায় ঠিক খাবার খাওয়ার জন্য না। কথা বলার জন্য। কথা বলার মধ্যে যে কত সুখ, সেটা গোপী মাসিও শুভ্র’র মায়ের কথা বলার আকাংখা দেখেই উপলব্ধি করে।

শুভ্র জব করে বৃদ্ধাশ্রমে। কিন্ত গোপী মাসি কাজ করে একটি বাড়ীতে। শুভ্র বৃদ্ধ ও বৃদ্ধাদের সাথে গল্প করে, অভিনয়ের হাসি হাসে। গোপী মাসিও শুভ্র’র মায়ের সাথে গল্প করে ও অভিনয়ের হাসি হাসে। বৃদ্ধ ও বৃদ্ধাদের প্রতিদিনের সুখ শুভ্রের ঐ মিথ্যে হাসিটুকুর মাঝেই। শুভ্র’র মায়েরও প্রতিদিনের সুখ ঐ গোপী মাসির মিথ্যে হাসিতেই।

অতঃপর, হাসি মিথ্যে, সুখ সত্য। গৃহ মিথ্যে, বৃদ্ধাশ্রম সত্য।

About Author /

Start typing and press Enter to search

You cannot copy content of this page