বালুচুরি

দেশে ট্রেন যাত্রায় ভোগান্তি চিরসঙ্গি; ঘন্টার পর ঘন্টা বিলম্বের পর যখন সবে ইঞ্জিনে গতি পায় খানিক না যাইতেই লাইনে দাড়ায় দম খায়; লাইন ক্লিয়ার নাই। তাই পাচ ঘন্টার রাস্তা যেখানে বিকাল চারটায় পৌছার  কথা সেটা নয় ঘন্টা পর রাত দশটা নাগাত স্টেশনে নামালো।

কথা ছিল পাত্রি পক্ষের লোক এখানে অপেক্ষা করবে কিন্ত ছয় ঘন্টা দেরি করার পর এতো রাতে এই আশা করাটা নিশ্চয়ই অপরাধ হবে। খালত ভাইয়ের বিয়ের কথা প্রায় পাকাপাকি; এই সময় বাড়ির লকজন বলছে মে’র ব্যাপারে ভালো করে খোজখবর নাও। এর পরেও মেজাজ অগোছালো হয়ে আসছিল; বিয়েটা ভেঙ্গে দিতে পারলেই যেন বাচি। খালা বলেন- লাউয়ের আগে জাত বড়, পাত্রীর চেয়ে বংশ বড়। আমার উপর আদেশজারি করলেন – গ্রামে গিয়ে পুঙ্খানু পুঙ্খ খোজ নিতে হবে, ঐ বংশের লোকেরা কে কি করে, জমি জিরাত ক্যামন আরো হাবিজাবি। উঃ, যেন পুরা বংশের ডিএনএ বিস্লেশনের কারবার।   

ছোট্ট স্টেশন আর এই  রাতে সেটা পুরাই ফাকা, শুধু দুইজন কাথামুরি দিয়ে প্লাটফর্মের উপরে ঘুমাচ্ছে আর তাদের পাশেই এক বৃদ্ধা সুপারি কাটছেন। মোবাইলে একফোটা নেটওয়ার্ক না, এবার ঢাকা গিয়ে সিমটা পাল্টাবই। বৃদ্ধাকে জিজ্ঞেস করলাম – আচ্ছা সুন্দরগঞ্জ এর রাস্তা চিনেন? বৃদ্ধার মনোযোগ সুপারিতেই রইল, শুধু পাল্টা  জিজ্ঞেস করলো – ক্যান? এই রাইত্তে?  

– ঢাকা থেকে এসেছি। এবার সুপারি কাটা থামলো – দূর আছে, নদীর ঐ পাড়ে। আগে ঘাটপার যাইবেন এর পর নাও ভাড়া। তিনি পাশেরজনের গায়ের কাথা টেনে ঘুমা ভাঙ্গানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু কাথামুড়ি দিয়ে ঘুমানো শরীরটা নড়েচড়ে আবার কুন্ডুলি পাকাতে লাগলো। তাতেই বৃদ্ধা চেতে গেলেন, হাতের সুপারিখানা ছুরে খ্যাচখ্যাচাতে লাগলেন – বেন্নিয়ার বাচ্চা, উট কইলাম……  

– ভ্যানে ঘাটপার যাওনের পর নাও ভারা কইরেন, ঘাট বেসি দূর না; শুনেন এহন কিন্তুক ম্যালা রাইত ভ্যানের ভারা বারতি পরবো, কুড়ি টাকা।  

আমার বয়সের এক চতুর্থাংশও নয় এমন একটা ছেলে আমায় ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে, বেচারা রাগে একটা কথাও বলছে না আমার সাথে; ওর কাছে নিজেকে আসামী মনে হচ্ছিল।   ঘাটে এসে যখন দাঁড়ালাম ক্ষুধায় পেট ঝমঝম করছে অথচ একটা দোকানও খোলা নাই। পায়চারি করতে করতে ঘাটের কিনারায় গেলাম। অন্ধকারে কিছু নৌকা বাধা আছে, একটাতেও আলো নাই, মাঝি তো দুরের কথা। প্রচণ্ড ভৌতিক নীরবতার মাঝে হঠাৎ কুপির আলো জ্বলে উঠল একটা নৌকার গলুইতে।

ভনিতা ভেঙ্গে যা ঘটেছিল তা বলছি- শয়তান আমার ঘারে চেপে বসেছে তাই এমন পবিত্র স্থানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। এটা একটা সার্বজনীন পবিত্র স্থান, হসপিটাল, যেখানের দেয়ালগুলো দোয়া আর প্রার্থনায় কাপে। এখানে সবার ধর্ম আলাদা হলেও আর্ত মানুষেরা, স্বজনেরা এতটা সাম্যবাদীতায় এবং একাগ্রতায় সৃষ্টিকর্তাকে আর কখনও ডাকে বলে আমার বিশ্বাস হয় না।       

হাত খরচ প্লাস জমানো সব টাকা ক্যাশ কাউন্টারে দিয়েও হাসি মুখে ধন্যবাদ জানিয়ে অপেক্ষা করছিলাম একটা সিএনজি করে সে দিন সন্ধায় বাড়ি ফিরব বলে। মনে মনে ঠিকও করে রেখেছিলাম মামা কে বলব কুড়িল ফ্লাইওভারের উপর দশ মিনিট দাড়িয়ে থাকব, এ জন্য ওনাকে একশ টাকা বেশি দিতেও রাজি, সে ফ্লাইওভার এর নিচে কোথাও অপেক্ষা করবে।

“আশার আলোকে

জ্বলুক প্রাণের তারা,

 আগামী কালের

প্রদোষ-আঁধারে

ফেলুক কিরণধারা”

রবি ঠাকুর-এর এই প্রার্থনা এখন আমারও। নৌকার কাছাকাছি যেতেই কানে এলো কতগুলা গালিগালাজ আর নালিশ – তোর বাপের বাড়ির লবন পাইছিস? তামান তরকারিত ঢালছিস ক্যা? তোর বাপের বাড়িত গোস্ত, মাচ চোখে দেখছিস?…  

মেজাজ গরমের এই অবস্থায় ডাকতে ইতস্তত বোধ করছিল তবুও ডাকলাম – ভাই, হ্যালো। নৌকা আপনার?

ছাউনির ভিতর থেকে বেড়িয়ে – ক্যান, কি চান? মাঝি উত্তরের অপেক্ষা না করেই আমার কাছে সিগারেট চাইলো, – মুখডা জইলা বিষ হইছে, কাছে আছে?

না ভাই। আমি খাই না। আপনি সুন্দরগঞ্জ চিনেন? যাওয়া যাবে এখন?

না চিনার কি? আমার নিজ গ্রাম। কিন্তু এহন নেওন যাইব না, নাও রিজাভ আচে।

বেশ অনুরোধের পর হারিকেন এ কেরোসিন ঢালতে ঢালতে বলল – উঠেন, এক কোনায় গিয়া বসেন; নাওয়ে উডাইতাম না, খালি গ্রামের সম্মান রাখলাম। চুপচাপ থাকবেন, যাত্রাপালা ভাঙ্গার পর স্টাট দিমু। আগে বৌয়ের হাট এ্যার পর সুন্দরগঞ্জ।

অপেক্ষার এক পর্যায় চোখ বুজে এলো। হঠাৎ কেউ একজন গা ঝাকিয়ে ডেকে তুলল – উডেন দেহি, ইঞ্জিন স্টাট দেই। চোখ মেলে যা দেখলাম তা অকল্পনীয়; গ্রাম্য অপ্সরা যেন শাড়ি পরে বসে আছে পাশে।  ইঞ্জিনের ভটভট শব্দের তালে নৌকা ভেসে গেলো আর হারিকেনের আলোয় দ্যাখা মুখটায় আমি।

ঐ মাগি, মাগি করিস ক্যা? আমার নাম নাই? আমার ট্যাকায় খাস, আমার ট্যাকায় ব্যাপসা করস আর আমারেই গালি দ্যাস?

ঐ মাগি, চেয়ারম্যান জানি কিছু আন্দাজ না করে কইলাম, আর জলদি কাম সারাবি; আলগা ভিমরতি অসইজ্য ধরে, এহন তৈয়ার হ সোন্দরমতো – নির্দেশনাগুলি নারীটি কে উদ্দেশ্য করে দিচ্ছিলেন সরদার টাইপের ভোম্বল লোকটা।   

– সারাদিন পুলিশ, প্যান্ডেল গুছানি, তার উপরে ঐ মাগিগুলার পিরিতের নাটক; গা জিরানের উপায় নাই। ঐ বাক্সডা সামলাইছোস তো? মাঝি উত্তরে – হ, নাও দুই ভাগ করলেও জিনিসের মালুম পাইব না।         

– আমারে একডা বোতল দিয়েন তো। মেজাজ খারাপ হইলে খামু, মাতাডা আইজকাইল খালি গরম থাহে, কাইল বৌডারে দিচি মাইর। মাঝির আবদারে ভোম্বল লোকটা হো –হো- হো করে হেসে দিলো। এর পর নৌকার পাটাতনে গায়ের চাদরটা বিছালো আর বালিশ মাথায় দিতেই নাক গড়গড় করতে লাগল।  

এসব খাপ ছাড়া কথায় আমার মোটেও কৌতূহল জন্মাল না বরং বুদ হয়ে চেয়ে রইলাম তার দিকে। কি অবাক সুন্দর! খোপা খুলে চুল আঁচড়াল, হাতে কাচের চুড়ি নিল, আর ছোট আয়নাটা আলোর কাছে ধড়ে কপালে টিপ পরল। হারিকেনের সেই মৃদু আলোতেও কাচাসোনা রঙের মুখটা জলজল করছে।

সুবির দা, নাও-এ কোন খাওন আছে? বেজায় খিদা লাগছে। মাঝির নাম যে সুবির এবারই জানলাম।  

হ, বাটির মইদ্দে আচে খানিক। অখাইদ্য; মজায় নাই, কসায় নাই, ঝাল কম, লবন বেশি…  

আমারে বিয়া করলেই পারো, দুইবেলা ভালাকইরা রাইন্দা খাওয়াইতাম, খিল খিলিয়ে হাসি…

চুপ থাকো, তুমি যাত্রাদলের নাইকা, নিজ হাতে কয়বার রান্দ জানি না বুজি…

সুবির খানিক মেজাজ দেখালেও মনে মনে খুশি হয়েছে তা স্পষ্ট।         

এই যে আপনি কিছু খেয়েছেন? শুনলাম ঢাকা থেকে যাচ্ছেন।

আমি ভীষণ অবাক হলাম, না রুপে না, আধুনিক বাচনভঙ্গিতে করা প্রশ্নে। নিজেই সামান্য খাবার ভাগাভাগি করে আমায় এগিয়ে দিল।

হাস্যল মুখে আমায় জিজ্ঞেস করল – আচ্ছা আমার শাড়িটা সুন্দর না? তাতের বালুচুরি, টাঙ্গাইল থেকে আনা। আমি মাথা নিচে নামালাম। আমি যে তার উপর মুগ্ধভাবে চেয়ে ছিলাম সেটা সে বুঝেছে।

খাবার মুখে চিবুতে চিবুতে কৌতূহলে জিজ্ঞেস করলো – আমি দেখতে ক্যামন? বিয়ে করবেন? রাজি থাকলে এখনি পালিয়ে ঢাকা যাব… ভয় পাইছে… আবার খিল খিল হাসি।

খাবার শেষে ঠোটে লিপস্টিক লাগাতে লাগাতে ভোম্বল্টাকে ধাক্কা দিলো – ঐ আমার ট্যাকার হিসাবটা কর।

খ্যাক করে ঘুম ছেরে উঠল – মাগি, তোর ফের ট্যাকা কি?ঐ মাগি, মাগি করিস ক্যা? আমার নাম নাই? আমার ট্যাকায় খাস, আমার ট্যাকায় ব্যাপসা করস আর আমারেই গালি দ্যাস?

ট্যাকা, ট্যাকা করবি না কইলাম, লাত্থি দিয়া পানিত ফালামু। প্যাট বাজাইছে দোকানদার আর ট্যাকা ঢালমু আমি?  

কতায় কতায় দোকানদাররে নাম; ও খালি দোকানদার আর তুই কিছু করিস নাই? আমার ট্যাকা চাই, না দিলে চেয়ারম্যানরে আইজি কইয়া দিমু, দেহি আমারে বেইচা আর কত খাস?

কি কস মাগি? টুটি চিপি দোকানদারের বিষ নামামু। বলেই সোজা এসে গলা চেপে ধরল। মেয়ে টি নৌকার পাটাতনে খক খক করছিল আর আত্মরক্ষার চেস্টা।

হঠাৎ  প্রচন্ড শব্দে নৌকা ধাক্কা খেল, আমি একেবারে ছিটকে গেলাম।  

সুবির কোনরকমে ইঞ্জিন বন্ধ করে নৌকা সামলাল। – নাও চরে আটকা পরছে, বাশ ঠেইলা দেহি কদ্দুর যায় … সুবির বাশ দিয়ে নৌকা ঠেলে নিল, বাকি আমরা চুপচাপ, ভয়ে বুক কাপছে তখনও। সেই ভয়ের সাথে কাপুরুষবোধতার বিষ যন্ত্রণা দিতে লাগল আমাকে। আমি কিছুই করলাম না, একটা প্রতিবাদও না? কেন?

খানিক বাদেই সুবির জানাল – এহন ক্লিয়ার। আবারও ইঞ্জিন স্টার্ট নিল আর ভট ভট শব্দে দ্রুত আগাতে লাগল।  আমার এক কথা শুইনা রাখ, কাইল কালিগঞ্জের হাসপাতাল নিমু, ঝামেলা বড় কইরা কাম নাই।

মেয়ে টি আর কোন প্রতি উত্তর করল না, সুধু উঠে এসে নৌকার ছাউনির বাইরে বসল, বার বার হাতের চুড়ি গুনছিল, এ হাতের চুড়ি গুনা শেষে আবার ওহাতেরগুলি।

একবার হাতের দুইটা চুড়ি খুলে পানিতে ফেলেও দিল, শ্যালো মেশিনের স্রোতে খনিকেই সেগুলা দূরে হারিয়ে গেল। এর পরেই ঝপ করে একটা শব্দ।

মেয়ে টি পানিতে লাফ দিয়েছে। হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলাম পানিতে।

সাথে সাথে নৌকা ঘুরিয়ে খোজাখুজি শুরু, পানিতে নেমেও দেখল সুবির। ভোম্বল্টা সুবিরকে দিয়ে নৌকা এদিক সেদিক ঘুরিয়ে অনেক চেষ্টা চালাল কিন্তু তার আর দেখা মিলল না। তখন ভোর প্রায় হয়ে এলো, হঠাৎ সুবির – ঐ যে, ঐ যে ……

দূরে তাকিয়ে দেখলাম একটা শাড়ি ভেসে যাচ্ছে, সেই শাড়িটা, তাতেবোনা বালুচুরি।      

পুনশ্চ ত্রিযামার (তিন প্রহর) তিনটি ঘটনার অথবা রাতের অংশগুলোর বাস্তব সত্যতা থাকতেই পারে অথবা আছে।

About Author /

Start typing and press Enter to search